ইভলিনের সঙ্গে তাঁর প্রথম প্রেম এবং বিয়ে। তিনি তখন ছাবিবশ বছরের যুবক। বিয়ের দু-বছর আগে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সদস্য হয়েছেন। একদিন ইভলিনকে বললেন, জানো, আমার প্রিয় দৃশ্য কী?
ইভলিন হেসে বললেন, এ-বিষয়ে আমরা তো কখনো আলাপ করিনি।
বলো শুনি। ইভলিন তাঁর ডান হাত টেনে নিজের হাতের মুঠোয় নেয়। আলতো করে চুমু দেয়।
আমার প্রিয় দৃশ্য সূর্যাস্ত। আমি একা বসে এই দৃশ্য দেখতে ভালোবাসি। সঙ্গে গান থাকবে।
মৃদুলয়ের সংগীত।
বেশ তো ভালো কথা। প্রত্যেক মানুষেরই একা কিছু বিষয় উপভোগ করার আনন্দ থাকতে হয়। অন্যকে সঙ্গী করার দরকার হয় না।
তোমার তাই মনে হয়? আমি চেয়েছিলাম তুমি আর আমি একসঙ্গে সূর্যাস্ত দেখব।
একদিন-দুদিন দেখতে পারি। তবে বেশিদিন না।
খুব মৃদুভাবে তিনি একটি ধাক্কা খেলেন। মন খারাপ হয়ে গেল তাঁর। ইভলিন সামনে নেই। কোনো কাজে ঘরের কোথাও গেছে। রান্নাঘর বা শোবার ঘরে হতেই পারে। তাঁর মনের ভেতরে জেগে ওঠে দৃশ্যপট। সূর্যটা বিদায় নিচ্ছে। চারপাশ লাল হয়ে উঠেছে। রক্তাভ আকাশ, তিনি নিজেকেই বলেন। মনে পড়ে কুনু গ্রামে দেখা সেই সূর্যাস্তের কথা। শৈশবের নয় বছর কেটেছে ওখানে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতেন, আকাশ তোমার লাল রং আমাকে সারাদিন দেখাও। লাল আকাশ শুধু তুমি আমার। তোমার সূর্যাস্তের সবটুকু আমার। দু-বছরের মাথায় যখন বয়স নয় হয়েছে তখন ভেবেছেন, আকাশ কেন একা আমার হবে। এসব ন্যাংটো ছেলে, যারা মাঠে ছাগল-ভেড়া চরায় তাদেরও। আমি ছাগল-ভেড়া না চরালে কী হবে, আমরা সবাই এক। কুনু গ্রাম আমাদের সবার। এ-কথা ভাবার সঙ্গে সঙ্গে সেদিন বিস্ময়ে নিজের দিকে তাকিয়েছিলেন। ছেলেদের জড়ো করে বলেছিলেন, বাড়ি যাওয়ার সময় হলো আমাদের। তার আগে এই লাল আকাশ দেখব। ওজালা হি-হি করে হেসে বলেছিল, দেখার কী আছে। ও তো আমরা রোজই দেখি। সূর্য তো ডুববেই। আবার উঠবে। আমরা তো রোজই দেখব।
তিনি গম্ভীর স্বরে বলেছিলেন, আমি ভাবি সূর্যাস্তের দৃশ্য আমার। আমার।
আবার সেই হা-হা হাসির ধ্বনি খোলা প্রান্তরে ছড়ায়। ওরা নিজ নিজ ছাগল-ভেড়া জড়ো করে বাড়ির পথে রওনা করে। তাঁর কোনো ছাগল-ভেড়া নেই। তিনি ওদের সঙ্গে খেলতে আসেন। ওদের সঙ্গে যেতে যেতে তিনি বুঝেছিলেন, এই দৃশ্য ওদেরও। ওদের সবার। কুনু গ্রাম আমাদের। বাইরের কোনো লোকের না।
এখন তিনি রোবেন দ্বীপে। জেলখানায় বন্দি। তাঁকে বাগান দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কাজটি তিনি মনের আনন্দে করেন। কেপটাউন থেকে পঁচাত্তর কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপটিতে বন্দি দিন কাটিয়ে ভাবছেন, জেলখানা তো শুধু দেয়াল মাত্র নয়। এই গাছের সারিতে তিনি কুনু গ্রামের গাছপালা প্রান্তর দেখতে পান। সূর্যাস্তের আগে তাঁকে ঘরে ঢোকানো হয়। তাতে তাঁর কিছু এসে-যায় না। তিনি বুকের ভেতরের আকাশে সূর্যাস্ত দেখতে পান। শৈশবের খেলার সাথিদের হাসি শুনতে পান। মাটি আর মানুষের ভেতর থেকে ফুটে ওঠা প্রিয় স্বদেশের স্বাধীনতা দেখতে পান।
সেলিনা হোসেন
সেলিনা হোসেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক, যিনি ১৪ জুন ১৯৪৭ তারিখে রাজশাহী শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা এ কে মোশাররফ হোসেন ছিলেন রেশমশিল্প কারখানার পরিচালক এবং মাতা মরিয়মন্নেসা বকুল। ষাটের দশকের মধ্যভাগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময়ে লেখালেখির শুরু করেন এবং তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ "উৎস" ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয়। সেলিনা হোসেনের লেখালেখির কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশের মানুষ, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য, এবং তিনি বাংলার লোক-পুরাণের চরিত্রসমূহকে নতুনভাবে তুলে এনেছেন। তাঁর উপন্যাসে সমকালের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট, ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ প্রতিফলিত হয়েছে। সাহিত্যে তাঁর পরিচিতি শুধু কথাসাহিত্যেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রবন্ধেও তিনি শক্তিশালী ও শাণিত গদ্য নির্মাণে দক্ষ।