
চন্দ্রলেখা (হার্ডকভার)
চন্দ্রলেখা, যাকে তার দাদা চন্দ্র নামে ডাকে।মোক্তার মিয়াও ডাকে চন্দ্র বইলা। বর্তমানে বিষয় ভিত্তিক কাজ তুলনামূলক কম।কোন জনপদ ও গ্রামাঞ্চল কে ঘিরে উপন্যাসের সংখ্যা আরো কম। এমন সময়ে গ্রাম বাংলার গল্প নিয়ে উপন্যাস। তাও আবার গ্রাম্য ভাষায়। বর্তমানে যা তেমন চোখে পারেনা। দুএকটা পাওয়া গেলেও তারমধ্যে লুতুপুতু প্রেম আর ঘুরানো প্যাঁচানো কাহিনি দিয়ে ভরপুর। এমন সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারায় গ্রাম বাংলার নোংরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক অবস্থান গল্পের আকারে বর্ণনা ও বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা এবং উপন্যাসের মাধ্যমে একটা শ্রেণির কাছে বার্তা পৌঁছনো আমি মনে করি সাহসের কাজ। এই দিকগুলা খেয়াল রাইখা লেখক চন্দ্রলেখা উপন্যাসে যথাযথ ভাবে তার লেখালেখির মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। চন্দ্রলেখা উপন্যাস একটি সামাজিক উপন্যাস। দুই নারীর জীবনের সংগ্রামের উপন্যাস।পুরুষতান্ত্রিক সমাজে স্বামীহীনা এক অসহায় নারীর জীবনবৃত্তান্ত। সামাজিক ভাবে কতো চড়াই উতরাই পার করে একজন নারীকে বেচে থাকতে হয়।সমাজের কুদৃষ্টি কিভাবে গ্রাস করে এবং হার না মেনে কিভাবে সংগ্রাম করতে হয়। লেখক তা যথাযথ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রতিটা চরিত্রের মধ্যে দেখিয়েছেন পাকা হাতের লেখনি। উপন্যাসটা পড়ে মনে হবে লেখক যেনো নিজের গল্প বলছেন। প্রতিটা প্লাটের শেষে এতোটা ধূম্রজাল তৈরি করেছেন যা পরের ঘটনা জানার আগপর্যন্ত প্রচণ্ড আগ্রহ তৈরি করে। থানার বারান্দায় বইসা কান্নাকাটি শুরু করে দেয় লায়লা বানু। পাশে বইসা আছে ছোট হাবু। উপস্থিত লোকজন কৌতূহল নিয়ে লায়লা বানুর দিকে দৃষ্টিপাত করেন।থানার কর্তব্যরত ডিউটি আফিসার বিরক্তি নিয়ে কনস্টেবলদের আদেশ দিলেন আপদ বিদায় করো। অবস্থা বেগতিক দেখে শশী মাকে থামাতে মরিয়া হয়ে উঠে। লায়লা বানু স্বামীর চিন্তায় অস্থির হয়ে পরেন। থানার বারান্দায় জীবনে পা না রাখা মানুষটা বুঝতে পারেনা। কান্নাকাটি করে কোন লাভ হবেনা। মোক্তার মিয়া আটক হইছেন কাশেমের জবান বন্দিতে। ডাকাতির মাল বিক্রিতে সাহায্য ও আন্ডারগ্রাউন্ডের পার্টির লোকের সাথে তার সম্পৃক্ততা কথা দাবী করেছেন পুলিশ। করাত কলে কাজ করা দিনমজুর মোক্তার মিয়া শশীর বাবা। এমন কাজ করতে পারেনা বইলা বিশ্বাস হয়না শশীর। কিন্তু তাদের কথা কে মানে। কোটকাচারিতে ঘুরতে ঘুরতে দীর্ঘ সময় পার হইলেও মোক্তার মিয়ার জামিন হয়না।তারিখের পর তারিখ অতিবাহিত হইয়া যায়। লায়লা বানু ঘুমথেকে উঠে পাশে খেয়াল কইরা দেখে মানুষটা পাশে নাই। বিছানা খালি পইরা আছে।বহুদিন পরে ঘড়ে ফিরা স্বামী হটাৎ গায়েব হইয়া যাওয়াতে। লাললা বানুর আন্তরে ভয় কাজ করতে শুরু করে। লালয়া বানু বিলাপ শুরু কইরা দেয়।শশী ঘুম থেকে উঠে কুলকিনারা করতে পারেনা। বহু খোঁজাখুঁজি কইরা মোক্তার মিয়া পেট চিরা লাশ পাওয়া যায় করাত কলের পাশে। আমরা যখন সিনেমা দেখি কিছু চরিত্র থাকে যাকে মাইনা নিতে কষ্ট হয়। মনের অজান্তে মুখ দিয়ে বকা চইলা আসে। উপন্যাসে তালেবের চরিত্রটা ঠিক তেমন। পুড়ো উপন্যাস জুইড়া তালেবের প্রতি আমার প্রচুর রাগ জন্মাইছে। মুহুর্তে শেষ করে দিতে ইচ্ছা করছে হারামিটাকে। উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ অবধি আতাহার চেয়ারম্যানের ভূমিকা থাকে রহস্যময় কখনো লোকটাকে ভালো মানুষ মনে হবে। কখনো মনে হবে ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে বিদঘুটে চেহারা। যার সকল কর্মকাণ্ডের পিছনে লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক চক্রান্ত। চেয়ারম্যানের এই ভূমিকা লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন গ্রামাঞ্চলের নোংরা রাজনীতির। একটা সময় গ্রামগঞ্জে সর্বহারাদের উৎপাত ছিলো বেপক। সেই ঘটনার আলোকে তৈরি চরিত্র হইলো চেয়ারম্যানের ভাই। যার নাম মোতা খাঁন খতম পার্টির লিডার। দীর্ঘ বারোবছর পর মোক্তার মিয়ার জানাজায় তাকে দেখা যায়। গ্রামের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় নানায় গল্প যার ডালপালা ছাড়াই ছিটাইয়া যায় বহুদূর। তৈরি হয় নানা রহস্য। মতিনের চরিত্রটা উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে এসে মন খারাপ করে দেয়। গ্রাম বাংলার মাদরাসা শিক্ষায় কিছুটা কমতি আছে। যা আচর মতিনের জীবনে বইতে হয়েছে।আমি মাদরাসার স্টুডেন্ট এমন ঘটনা অস্বীকার করার মতোন না কিন্তু এই যায়গাটে আমার মনে হয়েছে ঘটনা কিছুটা অবাস্তব ও অবিশ্বাস হয়ে গিয়েছে। উপন্যাসের সকল চরিত্রের মাঝে সংগ্রামী ও সাহসী নারীর ভূমিকা শশীর। এক কথায় বলতে গেলে শশীর জীবনের গল্প জুইড়াই উপন্যাস। ইন্টার পরিক্ষায় ফল পাবার আগের দিন পিতাকে হারানোটা উপন্যাসের সবচাইতে কষ্টের মুহূর্ত আমার কাছে। শশী চাঁদের অর্থে ব্যাপহার হইলেও তার জীবন জুড়ে শুধুই অন্ধকার। কিন্তু শশীর জীবনে আলো হয়ে আসেন জামিল আহমেদ। ভালোলাগলো উক্তি, "জগতের কিছু কান্না আছে, যার ভাগ কাউকে দিতে হয় না। কিছু কান্না নিজের। কিছু কান্না আকান্ত গোপন" "যার ঠিক যে মানুষটা যায়, সে-ই কেবল ঠিক ঠিক ঐ মানুষটার জন্য শূন্য অনুভূতি ধারণ করতে পারে। অন্য কেউ পারে না, তা সে যতই নিকটে থাকা মানুষ হোক" "জীবন আসলে কোন সরল রেখা না।সবসময় সোজা পথে চলেও না জীবন। কারণ, কারন তোমার চিনা পথের বাহিরেও অসংখ্য পথ আছে। সেই সব পথ আবিষ্কারের আনন্দও আছে। হুট কইরা অচেনা কোন পথে ঢুইকা পইড়া আনন্দ না পাও, দুঃখ পাইও না। মনে রাখবা, চেনা পথের বাহিরে আর সব পথরে ভুল বলার সুযোগ নাই" অনুভূতি, উপন্যাস পড়ে আমি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম।আমার কাছে মনে হয়েছে একটা মানুষের জীবনে কতোটা কষ্ট আসতে পারে!। সর্বোপরি উপন্যাসটা একটা অনুপ্রেরণা। জীবন সংগ্রামে আপনাকে জয়ী হতে সাহায্য করবে।
#"চন্দ্রলেখা উপন্যাসের মূল চরিত্র 'শশী'। অসম্ভব মেধাবী,অদম্য আর অদ্ভুত এক চরিত্র হচ্ছে এই জান্নাতুন নুর শশী। তার দাদা চন্দ্র নামে ডাকে তাকে। গল্পটা লায়লা বানুরও। এছাড়াও হাবু, মোক্তার মিয়া, আতাহার চেয়ারম্যান, খতম পার্টির নেতা মোতাহার, কামাল পাশা, তালেব, ফোরকান গাজি, আবিদ, জামিল রায়হান এই চরিত্রগুলো আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সেই মোহ এখনো কাটেনি। মতিন চরিত্রটি আর বিশেষ করে আঠারোবাকি নদী পাড়ের খেটে খাওয়া মানুষ এবং তাদের আতংকিত জিবন এই দুইদিন আমাকে ঘুমোতে দেয়নি। চন্দ্রলেখা শশীর গল্প। গল্পটা লায়লা বানুরও। আঠারোবাঁকির তীরে দুই নারীকে ঘিরে আরও কিছু জটিল মানুষের গল্প চন্দ্রলেখা। তাই বইটি পড়লে আপনারা জানতে পারবেন আঠারোবাকির তীরে দুই নারীকে ঘিরে উপন্যাসটি সম্পর্কে।।।
SIMILAR BOOKS
